বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আওয়ামী লীগকে নিজের পরিবার মনে করতেন

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আওয়ামী লীগকে নিজের পরিবার মনে করতেন

দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমৃত্যু নিজের পরিবার বলে মনে করতেন। তাই তিনি সবসময় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সহযোগিতা করার জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক রোববার বঙ্গমাতার ৯১তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে বলেন, ‘যখনই বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হতো, বঙ্গমাতা তার নিজের পরিবারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ পরিবারের দেখাশোনা করতেন।’

অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘বঙ্গমাতা কীভাবে সহযোগিতা করতেন? এমন নয় যে বঙ্গমাতা জমিদার ছিলেন। এমন নয় যে, বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে তখন তার প্রচুর অর্থ ও সম্পদ আছে বলে বঙ্গমাতা তার পরিবার চালানোর জন্য তা ব্যয় করতেন।’

অধ্যাপক সিদ্দিক বলেন, ‘বঙ্গমাতা অল্প অল্প করে কিছু টাকা বাঁচাতেন এবং দুই পরিবারের- তার নিজের পরিবার এবং আওয়ামী লীগের দেখাশোনার জন্য অর্থ ব্যয় করতেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আরেফিন বলেন, যখন বঙ্গমাতার হাতে কোন সঞ্চয় থাকত না, তখন তিনি তার পরিবার এবং তার বৃহত্তর পরিবার আওয়ামী লীগ চালানোর জন্য আলমারী এবং ফ্রিজের মতো আসবাবপত্রও বিক্রি করে দিতেন।

সাবেক উপাচার্য আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারের বাইরে থাকতেন তখন তিনি আওয়ামী লীগ কর্মীদের সহায়তা করতেন। তাকে যখন কারাগারে যেতে হতো ঠিক তখনও একইভাবে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা বঙ্গমাতার কাছে আসতেন এবং তিনি তাদের সাধ্যমত সহযোগিতা করতেন।’

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, বঙ্গমাতা তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং ১৯৬৬ সালের সালের ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থান এবং জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামসহ এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বঙ্গমাতা অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন ছিলেন উল্লেখ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাসা বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল এবং বঙ্গমাতা তার বাসায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের খাদ্য পরিবেশন থেকে শুরু করে ঘুমানোর জায়গার ব্যবস্থা করা পর্যন্ত সবকিছু দেখভাল করতেন।

বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর পর আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গমাতার অবদান সবচেয়ে বড়।’ তিনি বলেন, বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর ছায়ার মতো কাজ করেছেন এবং জনসমক্ষে কোন বক্তৃতা-বিবৃতি না দিয়ে সর্বদা পর্দার আড়ালে থেকে আওয়ামী লীগের কর্মীদের সহযোগিতা করেছেন।

অধ্যাপক আরেফিন তার মন্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেন, এমন একটি দিনও ছিল না যেদিন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা খাবার না খেয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে বের হতে পেরেছেন কিন্তু কখনও-কখনেও এমন হতো যে তার নিজের বাসায়ই খাবারের ঘাটতি হতো।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় তার মা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে উল্লেখ করেছেন যে, বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ কর্মীরা তাদের বাসায় এসে খাবার গ্রহণ করতেন।

তিনি শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘কোন কোন দিন দেখা যেত বাড়িতে খাবারের ঘাটতি রয়েছে, কারণ অতিথির সংখ্যা বাকি খাবারের চেয়ে অনেক বেশি। অন্তত তাদের ডাল-ভাত তা খাওয়াতে হবে। এই মুহূর্তে কী করা যায়? এরপর মা পরিমাণ বাড়ানোর জন্য ডালে কিছু পানি মিশিয়ে সবাইকে খাবার পরিবেশন করতেন। কিন্তু কেউ আমাদের বাড়িতে আসবে অথচ কিছু না খেয়ে চলে যাবে, এটা আমার মায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।’

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আরেফিন বলেন, ‘শেখ হাসিনা তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন যে, তার শৈশবে কখনও কখনও ঘুম থেকে জাগার পর তিনি দেখতে পেতেন যে আলমারী বা রেফ্রিজারেটরের মতো কিছু আসবাবপত্র অনুপস্থিত এবং তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করলে বিষয়টি সম্পর্কে তার মা বলতেন ‘আমাদের এত আসবাবপত্রের দরকার নেই। সাদামাটা জীবন যাপন করাই উত্তম। তাই আমি সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছি।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, একদিন ঘুম থেকে ওঠার পর শেখ হাসিনা দেখলেন তাদের ফ্রিজ নেই এবং যখন তিনি তার মাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন জবাবে বঙ্গমাতা বললেন, ‘ফ্রিজের ঠান্ডা পানি থেকে তোমার সর্দি, কাশি হয়। তাই আমি ওটি বিক্রি করে দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আসলে বঙ্গমাতা আসবাবপত্র বিক্রি করেছিলেন আর্থিক টানাপোড়েন মেটাতে এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের সহযোগিতা করতেন। কিন্তু তিনি তার সন্তানদের ভিন্ন উপায়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছিলেন যাতে তার ছেলে-মেয়েরা আসল ঘটনা জেনে উদ্বিগ্ন না হয়।’

বিশিষ্ট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আরেফিন বলেন, ‘তাই, যদি আমরা একজন মা এবং একজন গৃহিণী কীভাবে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন এ কথা ভাবি তাহলে বলতে হবে, এটি সত্যিই অসাধারণ। এটি বেগম মুজিবের একটি বৈশিষ্ট্য। এই ধরনের অনেক ঘটনা আমরা জানি। আমরা শেখ হাসিনার নিজের স্মৃতি থেকে এটি জনেছি এবং বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতারাও বিভিন্ন সময়ে এসব উল্লেখ করেছেন।’

অধ্যাপক আরেফিন বলেন, বেগম মুজিব পুরোপুরি একজন নিখাদ গৃহিণী ছিলেন কিন্তু গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও ‘তার রাজনীতি সচেতনতা আমাদের বিমুগ্ধ করে। তিনি বলেন, বঙ্গমাতা মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ়, দূরদর্শী ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সুবেদার আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্য উল্লেখ করে অধ্যাপক আরেফিন বলেন, সুবেদার রাজ্জাক তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন যে, একদিন বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের আলোচনা চলছিল। কিন্তু তারা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছিলেন না। ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ঠিক আছে আমরা এখন এখানে সভা শেষ করি, পরে আবার বসব। বাসার ভেতর থেকে বেগম মুজিব বিষয়টি শুনে সেখানে এলেন। তিনি বলেন, না, আপনারা বসুন এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারা পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যান। সিদ্ধান্তে পৌঁছার পরই বৈঠক শেষ করবেন।’

তিনি বলেন, বেগম মুজিব বিভিন্ন সময় অনেক মূল্যবান পরামর্শ দিতেন যা দল ও বিভিন্ন লড়াই-সংগ্রামে বেশ ফলদায়ক হয়েছে। আর বঙ্গবন্ধুও সবসময় বঙ্গমাতার যেকোন পরামর্শকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন।- বাসস

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Contact Us